আশুলিয়ায় জোড়া খুনের মামলায় গ্রেপ্তার মনিরুজ্জামান মাতুব্বর। ছবি: পুলিশের সৌজন্যে
স্ত্রীকে হত্যার অভিযোগে ১২ বছর আগে মামলা হয়েছিল মনিরুজ্জামান মাতুব্বর ওরফে হৃদয়ের বিরুদ্ধে। ওই মামলায় চার বছর কারাভোগের পর জামিনে মুক্ত হয়ে আবার আত্মগোপনে চলে যান তিনি। এরপর একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সর্বশেষ ঢাকার আশুলিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী ও তাঁর স্বামীকে হত্যার ঘটনায় তদন্তে তাঁর নাম আসে। গ্রেপ্তারের পর ওই হত্যাকাণ্ডের দায় আদালতে স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে মনিরুজ্জামান ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
স্ত্রী হত্যার অভিযোগে মামলা
মনিরুজ্জামান মাতুব্বর ওরফে মনির হোসেন ওরফে হৃদয় মাতুব্বরের বয়স ৪৪ বছর। তাঁর বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা উপজেলার দামদরদি গ্রামে।
পুলিশ জানায়, ২০১৪ সালে নিজের স্ত্রী রাহেলা বেগমকে হত্যার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, ঘুমন্ত অবস্থায় স্ত্রীকে শ্বাসরোধে হত্যা করে তিনি পালিয়ে যান। পরে ঢাকা থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। এ ঘটনায় নগরকান্দা থানায় হত্যা মামলা হয় এবং আদালতে অভিযোগপত্র দেওয়া হয়।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নগরকান্দা থানার তৎকালীন উপপরিদর্শক (এসআই) আবদুল কুদ্দুসের ভাষ্য, মনিরুজ্জামান বিয়ের পরও নানা কারণে প্রতিবেশী ও স্থানীয়দের সঙ্গে বিরোধে জড়াতেন। স্ত্রী হত্যা মামলায় চার বছর কারাভোগের পর ২০১৮ সালে জামিনে মুক্তি পান তিনি।
পরে কিছুদিন বাড়িতে থাকার পর আবার আত্মগোপনে চলে যান মনিরুজ্জামান। স্ত্রী হত্যা মামলায় নিয়মিত আদালতে হাজির না হওয়ায় তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানাও জারি হয় বলে পুলিশ জানায়।
আশুলিয়ায় আত্মগোপন, এরপর জোড়া খুনের অভিযোগ
জামিনে মুক্ত হওয়ার পর মনিরুজ্জামান ঢাকার সাভারের আশুলিয়া এলাকায় আত্মগোপন করেন। সেখানেই তাঁর বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অপরাধে জড়িয়ে পড়ার অভিযোগ ওঠে।
গত ৫ সেপ্টেম্বর রাতে আশুলিয়ার মধ্য জামগড়ার একটি আবাসিক ভবনের ফ্ল্যাট থেকে অন্তঃসত্ত্বা নাজমা বেগম (৩৯) ও তাঁর স্বামী আলমগীর কবিরের (৪৫) মরদেহ উদ্ধার করা হয়। নাজমা একটি তৈরি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন। আলমগীর তখন বেকার ছিলেন। তাঁদের বাড়ি দিনাজপুরের নবাবগঞ্জ উপজেলায়।
নাজমার বড় বোন শাপলা বেগমের করা মামলার তদন্তভার নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ঢাকা জেলা।
পিবিআই জানায়, তদন্তে প্রথমদিকে হত্যাকাণ্ডের কোনো স্পষ্ট সূত্র পাওয়া যাচ্ছিল না। পরে তথ্যদাতাদের মাধ্যমে মনিরুজ্জামানকে সন্দেহভাজন হিসেবে শনাক্ত করা হয়। ৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়ার নরসিংহপুর এলাকা থেকে তাঁকে আটক করা হয়।
পিবিআইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান আলমগীর ও তাঁর অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে হত্যার কথা স্বীকার করেন। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে নাজমার মুঠোফোন, সিমকার্ড, পরিচয়পত্র ও পার্স উদ্ধার করা হয়।
দাওয়াত দিয়ে ডাকার পর হত্যার অভিযোগ
পিবিআই কর্মকর্তা শামসুল আরেফিনের ভাষ্য অনুযায়ী, আশুলিয়ায় থাকার সময় মনিরুজ্জামানের সঙ্গে আলমগীরের পরিচয় হয়। মনিরুজ্জামান সবজির ব্যবসা করতেন। আলমগীরের সঙ্গে তাঁর স্ত্রী নাজমার সম্পর্ক নিয়ে বিরোধ তৈরি হয়েছিল বলেও তদন্তে উঠে এসেছে।
পুলিশের তদন্ত অনুযায়ী, গত ২ সেপ্টেম্বর আলমগীর ও নাজমা মনিরুজ্জামানকে দাওয়াত দিয়ে বাসায় ডেকে নেন। সেখানে নাজমার সঙ্গে সম্পর্কের বিষয় নিয়ে আলমগীর ও মনিরুজ্জামানের মধ্যে কথা-কাটাকাটি ও ধস্তাধস্তি হয়।
পিবিআইয়ের দাবি, একপর্যায়ে নাজমা মনিরুজ্জামানকে ঝাঁটা দিয়ে আঘাত করেন। জবাবে মনিরুজ্জামান নাজমার পেটে লাথি মারেন। এতে তিনি পড়ে যান এবং তাঁর গর্ভের সন্তানও মারা যায় বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
এরপর আলমগীর মনিরুজ্জামানকে খুন্তি ও পাইপ দিয়ে আঘাত করেন। একপর্যায়ে মনিরুজ্জামান আলমগীরের গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করেন বলে পিবিআই জানায়।
পরে আলমগীরের মরদেহ সিলিং ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়। নাজমার মুঠোফোন, সিমকার্ড, পরিচয়পত্র ও পার্সও নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনায় আদালতে মনিরুজ্জামানের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
ধর্ষণ ও হত্যার আরেক মামলায় নাম
পিবিআইয়ের তদন্তে ২০২২ সালের আরেকটি গুরুতর হত্যাকাণ্ডেও মনিরুজ্জামানের নাম উঠে এসেছে বলে জানিয়েছেন কর্মকর্তারা।
তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালের ২২ ডিসেম্বর মনিরুজ্জামান ও তাঁর দুই সহযোগী এক নারীকে ধরে আশুলিয়ার নয়ানগরের একটি জঙ্গলে নিয়ে যান। সেখানে ওই নারীকে দলবদ্ধ ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
পিবিআই জানায়, জিজ্ঞাসাবাদে মনিরুজ্জামান এ ঘটনার কথাও স্বীকার করেছেন। ওই মামলায় গ্রেপ্তারের প্রায় আট মাস পর তিনি জামিনে মুক্তি পান বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পরিবারের সঙ্গেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন
মনিরুজ্জামানের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবারের সদস্যরাও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বন্ধ করে দিয়েছেন বলে স্বজনেরা জানিয়েছেন।
তাঁর বড় বোন তাসলিমা বেগমের ভাষ্য, মনিরুজ্জামান ছোটবেলা থেকেই উগ্র ও অবাধ্য স্বভাবের ছিলেন। তাঁর আচরণ নিয়ে পরিবারের সদস্যরা অসন্তুষ্ট ছিলেন। প্রায় ৪০ দিন আগে মনিরুজ্জামানের বাবা জব্বার মাতুব্বর মারা গেছেন। তাঁর মা অসুস্থ।
তাসলিমা বেগম জানান, পরিবারের সদস্যরা মনিরুজ্জামানের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করেছেন। তাঁর বিরুদ্ধে চলমান মামলাগুলোতে আইনি প্রক্রিয়ায় যে সিদ্ধান্তই হোক, পরিবারের পক্ষ থেকে তাতে আপত্তি নেই।
মনিরুজ্জামানের প্রথম স্ত্রীর সংসারে একটি মেয়ে রয়েছে। বর্তমানে মেয়েটির মা তার পড়াশোনার দেখাশোনা করছেন।
পিবিআই কর্মকর্তারা বলছেন, স্ত্রী হত্যার অভিযোগের মধ্য দিয়ে যে মামলাজটিলতা শুরু হয়েছিল, পরবর্তী সময়ে মনিরুজ্জামানের বিরুদ্ধে একের পর এক গুরুতর অপরাধে জড়ানোর অভিযোগ সামনে এসেছে। সর্বশেষ আশুলিয়ায় অন্তঃসত্ত্বা নারী, তাঁর স্বামী ও গর্ভের সন্তান হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি বর্তমানে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারে রয়েছেন।
হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া
নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com