ঢাকা, ০৮ অক্টোবর, ২০২৬
নিউজ ডেস্ক :
প্রকাশিত : ০৫:৩৪ এএম, ০৭ অক্টোবর ২০২৬
Digital Solutions Ltd

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মবের অভিযোগ তদন্তে নভেম্বরে বাংলাদেশে আসছেন জাতিসংঘের বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার

প্রকাশিত : ০৫:৩৪ এএম, ০৭ অক্টোবর ২০২৬

জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকারবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শাহিদ।

নিউজ ডেস্ক :

জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকারবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টিয়ার ফরিদা শাহিদ আগামী ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশে আসছেন। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের মবের শিকার হওয়ার অভিযোগ তিনি সরেজমিনে শুনবেন ও পর্যালোচনা করবেন। তাঁর বাংলাদেশ সফরে সহায়তা করবে জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেস্কোর ঢাকা কার্যালয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, ফরিদা শাহিদ ২৩ নভেম্বর থেকে ৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত বাংলাদেশে অবস্থান করবেন। তাঁর সফরের বিস্তারিত কর্মসূচি নভেম্বরের শুরুতে চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে।

সফরকালে মবের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি এসব ঘটনায় নিহত শিক্ষকদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গেও কথা বলবেন তিনি। ক্ষতিগ্রস্তদের অভিযোগ, জোরপূর্বক পদত্যাগ, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, বেতন-ভাতা বন্ধ এবং কর্মস্থলে যেতে বাধা দেওয়ার মতো ঘটনা ঘটেছে।

মবের শিকার শিক্ষকদের সংগঠন ‘পদবঞ্চিত প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষক জোট’-এর দাবি, বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক মবের ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তাদের মধ্যে অন্তত আটজন শারীরিক ও মানসিক আঘাতের পর মারা গেছেন এবং পাঁচ শতাধিক শিক্ষক আহত বা অসুস্থ হয়েছেন। সংগঠনটির হিসাবে, প্রায় ৯৪০ জন শিক্ষক এখনো বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না। ক্ষতিগ্রস্তদের বড় একটি অংশ বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক।

জোটের নেতাদের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের বিষয়ে সরকার বিভিন্ন সময়ে নির্দেশনা জারি করলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা বাস্তবায়ন করেনি। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে অনেকে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। কারও শিক্ষক ইনডেক্স বাতিল হয়েছে, আবার কারও বেতন-ভাতা বন্ধ রয়েছে। আদালত ও শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আবেদন করেও অনেকে প্রতিকার পাননি বলে দাবি তাদের।

জোটের সভাপতি ও ঢাকা সিটি কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ মো. বেদার উদ্দিন আহমেদ বলেন, তারা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরে অভিযোগ ও স্মারকলিপি দিয়ে আসছেন। জাতিসংঘের প্রতিনিধিরা ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও তাদের পরিবারের বক্তব্য শুনলে ঘটনার প্রকৃত চিত্র উঠে আসবে বলে তিনি আশা করেন।

সংগঠন সূত্রে জানা গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকরা তাদের অভিযোগ ও তথ্য-উপাত্ত জাতিসংঘের শিক্ষা অধিকারবিষয়ক বিশেষ র‍্যাপোর্টারের কাছে পাঠিয়েছেন। এ জন্য নির্দিষ্ট একটি ফরমও দেওয়া হয়েছিল। সেখানে ঘটনার বিবরণ, বর্তমান অবস্থা, মামলা বা অভিযোগের তথ্য এবং ছবি, ভিডিও, অডিওসহ সহায়ক নথি দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত কতজন শিক্ষক অভিযোগ পাঠিয়েছেন, তা জানা যায়নি।

একই সময়ে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে তৎকালীন সরকারি দলের ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে যুক্ত শিক্ষার্থীদেরও মবের শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সংগঠনের পদধারী কিছু শিক্ষার্থী শ্রেণিকক্ষে ফিরতে পারেননি এবং কেউ কেউ পরীক্ষা দিতে গিয়েও বাধার মুখে পড়েছেন বলে দাবি করা হয়েছে।

নির্দেশনা জারির পরও অনেকে কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি

শিক্ষকদের জোরপূর্বক পদত্যাগের ঘটনায় ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন শিক্ষা ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ওয়াহিদউদ্দিন মাহমুদ উদ্বেগ প্রকাশ করেন। পরে শিক্ষা মন্ত্রণালয় জোরপূর্বক পদত্যাগ গ্রহণযোগ্য নয় জানিয়ে নির্দেশনা জারি করে।

২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের সমস্যার সমাধান না হওয়া পর্যন্ত বেতন-ভাতা চালু রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। একই বছরের ৭ এপ্রিলের প্রজ্ঞাপনে চাকরি পুনর্বহাল এবং ইএফটির মাধ্যমে বেতন-ভাতা চালুর কথা বলা হয়। পরে সরকারি নির্দেশনা অমান্যকারী ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানানো হয়।

সর্বশেষ চলতি বছরের ১ জানুয়ারির পরিপত্রে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদানে বাধা দিলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এমপিও স্থগিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। তবে শিক্ষক নেতাদের অভিযোগ, এরপরও অনেক প্রতিষ্ঠান এসব নির্দেশনা বাস্তবায়ন করেনি।

তাদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কেউ কেউ এখনো ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের বেতন-ভাতা চালু করেননি। ইএফটি চালুর প্রয়োজনীয় তথ্যও অনেক ক্ষেত্রে হালনাগাদ করা হচ্ছে না। ফলে প্রায় ৯৪০ জন শিক্ষক বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত রয়েছেন এবং প্রায় সাড়ে চার হাজার শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধান কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি বলে সংগঠনটির দাবি।

হামলার পর হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার অভিযোগ

ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকদের একজন রাজধানীর আরমানিটোলার আনন্দময়ী বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নাজমা বেগম। তাঁর অভিযোগ, ২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট তাঁকে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক মোখলেছুর রহমান ও তাঁর সহযোগীরা জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করেন। একই দিন কমিটির অনুমোদন ছাড়াই মোখলেছুর রহমান ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব নেন বলে দাবি করেন তিনি।

নাজমার অভিযোগ, এরপর তাঁর স্কুল ও সরকারি বেতন-ভাতা বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং তাঁর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়। তদন্তের কাজে বিদ্যালয়ে গেলে তিনি হামলার শিকার হন এবং অচেতন হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। পরে পুলিশ তাঁকে বাসা থেকে নিয়ে থানায় এবং আদালতে পাঠায় বলেও জানান তিনি।

নাজমা বেগম বলেন, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে জেলা প্রশাসনের তদন্তে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি। পরে মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর তাঁর সরকারি বেতন ছাড় করে। তবে বদলির প্রয়োজনীয় এনওসি ও পাসওয়ার্ডসংক্রান্ত জটিলতা এখনো পুরোপুরি কাটেনি বলে দাবি করেন তিনি।

জোর করে পদত্যাগে সই নেওয়ার অভিযোগ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ কেকা রায় এবং সহকারী অধ্যাপক ড. ফারহানা খানমও ২০২৪ সালের আগস্টে জোর করে পদত্যাগে বাধ্য হওয়ার অভিযোগ করেছেন।

ফারহানা খানমের অভিযোগ, তাকে কয়েক ঘণ্টা আটকে রেখে পদত্যাগপত্রে সই নেওয়া হয়। এমনকি সাদা কাগজেও বাংলা ও ইংরেজিতে স্বাক্ষর নেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন তিনি। কেকা রায়কেও জোর করে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে তার অভিযোগ।

পদবঞ্চিত শিক্ষক জোটের নেতাদের দাবি, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষার্থী ও বহিরাগতদের একটি অংশকে ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, কোথাও পদ দখল, কোথাও ব্যক্তিগত বিরোধ এবং কোথাও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে এসব ঘটনা ঘটেছে।

মবের মাধ্যমে পদত্যাগ করানোর পর কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে ভারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানপ্রধান নিয়োগ, শিক্ষককে বাধ্যতামূলক ছুটি বা অবসর দেওয়া এবং বরখাস্ত করার ঘটনাও ঘটেছে বলে দাবি করেছেন তারা। এসব ঘটনায় প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদানের পরিবেশ ব্যাহত হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট সব প্রতিষ্ঠানের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

আদালতে গিয়েও অনিশ্চয়তা

জোরপূর্বক পদত্যাগ করা শিক্ষকদের অধিকার ও পুনর্বহাল নিয়ে একাধিক মামলা হয়েছে। রাজধানীর সোলমাইদ উচ্চবিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক আফরোজা বেগম জানান, তিনিও ২০২৪ সালে হাইকোর্টে রিট করেন। চলতি বছরের ২০ সেপ্টেম্বর পদত্যাগ করা শিক্ষকদের পক্ষে হাইকোর্টের একটি রায় হয়েছে বলেও তিনি জানান।

কুমিল্লা কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ নার্গিস আক্তার বলেন, প্রশাসনিক নির্দেশনা ও আদালতের আদেশ বাস্তবায়ন না হলে সংশ্লিষ্টদের জবাবদিহির আওতায় আনা প্রয়োজন। তা না হলে ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষকরা দীর্ঘদিন অনিশ্চয়তার মধ্যে থাকবেন।

শিক্ষার পরিবেশ নিয়েও উদ্বেগ

রাজধানীর বিসিএসআইআর উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ড. মো. ইদ্রিস আলী বলেন, শিক্ষককে অপমান, শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করা কিংবা মবের চাপে পদত্যাগে বাধ্য করা শুধু ব্যক্তিগত অধিকার লঙ্ঘন নয়, এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ে। প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের প্রশাসনিক কর্তৃত্ব দুর্বল হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শৃঙ্খলা ও পাঠদানের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

ক্ষতিগ্রস্ত শিক্ষক নেতাদের মতে, জাতিসংঘের পর্যালোচনায় জোরপূর্বক পদত্যাগ ও মব-সহিংসতার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, শিক্ষার পরিবেশ এবং শিক্ষার্থীদের ওপর এসব ঘটনার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবও গুরুত্ব পাওয়া উচিত।

জাতীয় বিভাগের অন্যান্য খবর

 Somoyer Kotha
Follow Us

হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।

সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া

নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com

২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com