রোহিঙ্গা সংকটের নয় বছরেও প্রত্যাবাসন শুরু হয়নি; সমাধানে চীনের ভূমিকার দিকে তাকিয়ে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সামরিক অভিযান, সংঘাত ও নির্যাতনের মুখে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার নয় বছর পূর্ণ হয়েছে আজ। দীর্ঘ এই সময়ে প্রত্যাবাসনের জন্য একাধিক উদ্যোগ নেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকেও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। এমনকি প্রত্যাবাসন কবে নাগাদ শুরু হবে, সেটিও এখনো নিশ্চিত নয়।
বর্তমানে সংকট সমাধানে চীনের ভূমিকার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে বাংলাদেশ। ঢাকা-বেইজিং-নেইপিদোর ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগের মাধ্যমে প্রত্যাবাসনের পথ তৈরি হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে প্রায় ১৫ লাখ রোহিঙ্গার এই সংকটকে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের আলোচনায় ধরে রাখাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট রাখাইনে মিয়ানমারের সামরিক অভিযান ও সহিংসতা তীব্র হলে প্রাণ বাঁচাতে সীমান্ত অতিক্রম করে কয়েক দিনের মধ্যেই বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় প্রায় ১০ লাখ রোহিঙ্গা। এরপর সংকট সমাধানে মিয়ানমারের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় অ্যারেঞ্জমেন্টসহ বিভিন্ন উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ।
প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর ভূমিকা নিয়েও শুরু থেকেই জটিলতা দেখা দেয়। এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা (আইওএম) নাকি জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা (ইউএনএইচসিআর)—কার ভূমিকা কী হবে, তা নিয়েও মতপার্থক্য ছিল।
২০১৯ সালে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ, চীন ও মিয়ানমারের মধ্যে ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ নেওয়া হলে প্রত্যাবাসন নিয়ে নতুন আশার সৃষ্টি হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই উদ্যোগও বাস্তবে প্রত্যাবাসন শুরুর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি।
দীর্ঘ নয় বছরে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে বাংলাদেশের অর্জন খুবই সীমিত। প্রথম দফায় প্রায় ৮০ হাজার এবং সাম্প্রতিক সময়ে আরও প্রায় ৩ লাখ রোহিঙ্গাকে নিয়ে যাচাই-বাছাইসহ কিছু অগ্রগতি হলেও তাদের মিয়ানমারের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি ও নিরাপদ প্রত্যাবাসনের নিশ্চয়তা এখনো বড় প্রশ্ন হয়ে আছে।
এর আগে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে জাতিসংঘ মহাসচিবকে সম্পৃক্ত করে প্রত্যাবাসন শুরুর বিষয়ে আশাবাদ প্রকাশ করেছিলেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরেও রোহিঙ্গা সংকটের টেকসই সমাধানে বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বেইজিং। ফলে ভূরাজনৈতিক নানা সমীকরণের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চীনের ভূমিকার দিকেই এখন বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে ঢাকা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের কৌশলগত অংশীদারত্ব নিয়ে সরকার আশাবাদী। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সম্পর্ক আরও শক্তিশালী হওয়ায় রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে আলোচনাকে এগিয়ে নেওয়ার নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
তার মতে, মিয়ানমার সরকারের সঙ্গেও সমন্বয় করে সংকট সমাধানের পথ খোঁজা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে চীনের প্রভাব ও কূটনৈতিক ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
বর্তমানে ১৫ লাখের বেশি মিয়ানমারের নাগরিকের দায়িত্ব বাংলাদেশের ওপর রয়েছে। তাদের খাদ্য, বাসস্থান, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক চাহিদা পূরণে আন্তর্জাতিক সহায়তাও আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। বৈশ্বিক সহায়তা কমে প্রায় অর্ধেকে নেমে আসায় চাপ আরও বাড়ছে।
এমন পরিস্থিতিতে পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতি নির্বাচিত হওয়াকে রোহিঙ্গা সংকট আন্তর্জাতিক পর্যায়ে নতুন করে তুলে ধরার সুযোগ হিসেবে দেখছে ঢাকা।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিশ্বে একের পর এক নতুন সংকট তৈরি হওয়ায় আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মনোযোগ দ্রুত এক ইস্যু থেকে অন্য ইস্যুতে চলে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বর্তমান অবস্থান কাজে লাগিয়ে রোহিঙ্গা সংকটকে আবারও বিশ্ববাসীর সামনে গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরা সম্ভব হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গা সংকটের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবে বাংলাদেশ নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যাতে ভবিষ্যতে জাতীয় ও আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকিতে পরিণত না হয়, সে বিষয়েও সতর্ক থাকতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত মাহফুজুর রহমান মনে করেন, বাংলাদেশকে ঘিরে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশের মধ্যে অর্থনৈতিক করিডোরসহ বাণিজ্যিক সহযোগিতার বড় সম্ভাবনা রয়েছে। এই বৃহত্তর স্বার্থের জায়গা থেকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চীন গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
রোহিঙ্গাদের হত্যা, নির্যাতন ও জাতিগত নিধনের অভিযোগে আন্তর্জাতিক আদালতে চলমান বিচারপ্রক্রিয়া দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, প্রত্যাবাসনের পাশাপাশি ন্যায়বিচার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে রোহিঙ্গাদের নিরাপদ ও টেকসই প্রত্যাবাসনের পরিবেশ তৈরিতে তা ভূমিকা রাখতে পারে।
নয় বছর পেরিয়ে গেলেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের নির্দিষ্ট সময়সূচি না থাকায় সংকটের স্থায়ী সমাধান এখনো অধরাই রয়ে গেছে। তাই চীনের কূটনৈতিক প্রভাব, মিয়ানমারের সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সক্রিয় ভূমিকার সমন্বয়েই প্রত্যাবাসনের পথ খুলতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া
নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com