সালমান শাহ মৃত্যু: ডনের গ্রেপ্তারের পর তদন্তে নতুন মোড়
জনপ্রিয় চিত্রনায়ক সালমান শাহর মৃত্যুর রহস্য ঘিরে প্রায় তিন দশক ধরে চলা আইনি ও তদন্ত প্রক্রিয়ায় নতুন করে গতি এসেছে। মামলার এজাহারভুক্ত আসামি খলনায়ক আশরাফুল হক ওরফে ডন গ্রেপ্তারের পর তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর, রিমান্ডের প্রস্তুতি এবং তদন্ত কর্মকর্তা পরিবর্তনের ঘটনায় মামলাটিতে নতুন মাত্রা যোগ হয়েছে।
নতুন তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির পরিদর্শক মুজিবুর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর পুরোনো মামলার নথি, জবানবন্দি, আলামত ও আগের তদন্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করছেন। পাশাপাশি এজাহারভুক্ত আসামিদের বাইরে থাকা সন্দেহভাজনদেরও প্রয়োজনে জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ডনকে রিমান্ডে নেওয়া হলে সালমান শাহর মৃত্যুর সময় ও তার আগের ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিছু প্রশ্নের উত্তর খোঁজা হতে পারে।
এর মধ্যে রয়েছে—১৯৯৬ সালের ৫ ও ৬ সেপ্টেম্বর ডন কোথায় ছিলেন, সালমান শাহর সঙ্গে তাঁর সর্বশেষ যোগাযোগ কখন ও কোথায় হয়েছিল এবং মামলার অন্য আসামি সামিরা হক, রেজভী আহমেদ, ডেভিড ও ফারুকের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক কী ছিল।
এ ছাড়া রাজসাক্ষী রেজভী আহমেদের ১৬৪ ধারায় দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করা ১২ লাখ টাকা লেনদেনের দাবির পেছনে বাস্তব কোনো ভিত্তি ছিল কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা হতে পারে।
তদন্ত কর্মকর্তা দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রায় ৩০ বছরের পুরোনো নথিপত্র ও আলামত মিলিয়ে দেখছেন। ঘটনার সময়কার চিকিৎসা নথি, ময়নাতদন্ত-সংক্রান্ত তথ্য এবং ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর ইস্কাটনের বাসায় উপস্থিত ব্যক্তিদের বক্তব্যও নতুন করে পর্যালোচনা করা হচ্ছে।
গত ৯ আগস্ট সৌদি আরব যাওয়ার সময় শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন থেকে ডনকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে সিআইডি তাঁকে হেফাজতে নেয়। আদালতের নির্দেশে ওই দিনই তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়।
এরপর ১২ আগস্ট ডনের পক্ষে জামিন আবেদন করা হলে রাষ্ট্রপক্ষ এর বিরোধিতা করে। শুনানি শেষে ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট তাঁর জামিন আবেদন নামঞ্জুর করেন।
ডন গ্রেপ্তারের পর সালমান শাহর মা নীলা চৌধুরী তাঁকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদের দাবি জানান। তাঁর বক্তব্য ছিল, ডনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে মৃত্যুর পেছনে থাকা ঘটনাগুলো সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
একই সঙ্গে তিনি মামলার প্রধান আসামি হিসেবে উল্লেখ করা সামিরা হক, তাঁর মা লতিফা হক লুসি এবং দীর্ঘদিন ধরে পলাতক আজিজ মোহাম্মদ ভাইকে গ্রেপ্তারের দাবি জানান।
ডনের গ্রেপ্তারের ফলে দীর্ঘদিন আইনের আওতার বাইরে থাকা মামলার এই আসামিকে সরাসরি জিজ্ঞাসাবাদের সুযোগ তৈরি হয়েছে। ফলে পুরোনো অভিযোগ, রেজভী আহমেদের ১৬৪ ধারার জবানবন্দি এবং কথিত ১২ লাখ টাকার লেনদেনের বিষয়গুলো নতুন করে যাচাই করতে চাইছে সিআইডি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, নতুন তদন্ত শুধু ডন বা মামলার এজাহারভুক্ত ১১ আসামির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তদন্তের প্রয়োজনে এজাহারের বাইরে থাকা ব্যক্তি, চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট মানুষ কিংবা অতীতে সন্দেহের তালিকায় থাকা ব্যক্তিদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হতে পারে।
তবে তদন্তের স্বার্থে কাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
ডনের জামিন শুনানিকে কেন্দ্র করে গত ১২ আগস্ট আদালত প্রাঙ্গণেও উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সালমান শাহর মামা ও মামলার বাদী আলমগীর কুমকুম অভিযোগ করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁর পরিবারের সদস্য শাহরানকে জীবননাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে। পরে এ বিষয়ে রমনা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন তিনি।
সিআইডির নতুন নেতৃত্বও মামলাটিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে বলে জানা গেছে। সম্প্রতি সিআইডি প্রধান হিসেবে অতিরিক্ত আইজিপি ব্যারিস্টার মোশাররফ হোছাইন দায়িত্ব নেওয়ার পর তিন দশক ধরে চলা এই মামলার তদন্ত নিরপেক্ষভাবে শেষ করার নির্দেশ দিয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এরই মধ্যে আটবার পিছিয়েছে। সর্বশেষ গত ২৩ জুলাই আদালত আগামী ৩০ আগস্ট তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার তারিখ নির্ধারণ করেছিলেন। এর মধ্যেই ডনের গ্রেপ্তার ও নতুন তদন্ত কর্মকর্তার দায়িত্ব নেওয়ায় তদন্তের গতিপথে পরিবর্তন এসেছে।
১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর ইস্কাটনের বাসায় সালমান শাহর মৃত্যু হয়। প্রথমে এ ঘটনায় অপমৃত্যুর মামলা করা হয়েছিল। পরে তাঁর বাবা কমরউদ্দিন আহমদ চৌধুরী ঘটনাটিকে হত্যা দাবি করে তদন্তের আবেদন করেন।
সিআইডির ১৯৯৭ সালের তদন্তে মৃত্যুকে আত্মহত্যা হিসেবে উল্লেখ করা হয়। এরপর পরিবার ওই সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে দীর্ঘ আইনি লড়াই চালায়। বিচার বিভাগীয় তদন্তেও হত্যার অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে বনজ কুমারের নেতৃত্বে পিবিআই দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০২০ সালে সালমান শাহকে হত্যা করা হয়েছে—এমন অভিযোগের পক্ষে প্রমাণ না পাওয়ার কথা জানিয়ে প্রতিবেদন দেয়। ওই তদন্তে ৫৪ জনের সাক্ষ্য ও জব্দ করা আলামত পর্যালোচনা করা হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে ওই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া হয়নি।
দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার পর ২০২৫ সালের ২০ অক্টোবর ঢাকার ষষ্ঠ অতিরিক্ত মহানগর দায়রা জজ আদালত সালমান শাহর মৃত্যুর ঘটনায় হত্যা মামলা করার পথ খুলে দেন। এর পরদিন ২১ অক্টোবর রমনা থানায় ১১ জনকে আসামি করে মামলা করা হয়।
মামলার আসামিরা হলেন—সামিরা হক, লতিফা হক লুসি, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, আশরাফুল হক ওরফে ডন, ডেভিড, জাভেদ, ফারুক, রুবী, আব্দুল ছাত্তার, সাজু ও রেজভী আহমেদ।
বর্তমানে মামলাটি তদন্তাধীন থাকায় তদন্তের অগ্রগতি নিয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসীম উদ্দিন।
হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া
নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com