জ্বালানি সংকট ও গ্যাস-বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
দেশের চলমান জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহ পরিস্থিতির দ্রুত উন্নয়ন এবং শিল্প খাতে গ্যাসের সরবরাহ বাড়াতে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে সময়মতো এলএনজি কার্গো আমদানি নিশ্চিত করতে সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) যতটা সম্ভব এড়িয়ে চলার নির্দেশও দিয়েছেন তিনি।
এ ছাড়া ২০২৯ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে বড় পরিসরের ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তুলতে জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করার পাশাপাশি পরবর্তী পাঁচ বছরের মধ্যে টেকসই জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়কে নির্দেশনা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী।
জ্বালানি সংকট নিয়ে বৃহস্পতিবার (২০ আগস্ট) সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী, সচিব ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকে দেশের বর্তমান বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতি, বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময়কার অবস্থার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র এবং ২০২৯ সাল পর্যন্ত মধ্যমেয়াদি ও ২০৩৫ সাল পর্যন্ত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা তুলে ধরা হয়।
সভায় গ্যাস, জ্বালানি তেল, কয়লা, ফার্নেস অয়েলসহ বিভিন্ন জ্বালানির চাহিদা ও সরবরাহ পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে কোন জ্বালানি থেকে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে, সে বিষয়েও বিস্তারিত আলোচনা হয়।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক বিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর সাংবাদিকদের জানান, আগামী শীতকালের মধ্যে শিল্পে গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি হবে। পাশাপাশি আগামী গ্রীষ্মের মধ্যে গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
২০২৯ সাল পর্যন্ত ধাপে ধাপে দেশের জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নয়ন কীভাবে করা হবে, সে বিষয়ে একটি বিস্তারিত রূপরেখাও চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। বিনিয়োগকারীদের জ্বালানি প্রাপ্তি নিয়ে আগাম ও স্পষ্ট ধারণা দিতে সরকার একটি সমন্বিত পরিকল্পনা তৈরি করতে চায়।
জ্বালানি তেলের ক্ষেত্রে সরকার ৯০ দিনের মজুদ গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে। আগামী ৩০ আগস্ট পর্যন্ত যেসব জ্বালানি তেল আমদানির এলসি খোলা হয়েছে, সেগুলোর চালান সময়মতো দেশে পৌঁছালে ৫৭ দিনের মজুদ নিশ্চিত হবে বলে জানিয়েছে জ্বালানি বিভাগ।
বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় দেশে মাত্র ১৪ দিনের জ্বালানি তেলের মজুদ ছিল বলে বৈঠকে জানানো হয়।
তবে স্বল্পমেয়াদে গ্যাস সংকট মোকাবিলায় সরকারের হাতে খুব বেশি বিকল্প নেই। এ কারণে বিদ্যমান দুটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল বা এফএসআরইউয়ের সক্ষমতা অনুযায়ী গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (ডিপিএম) ক্রয়াদেশ দেওয়া ছয়টি এলএনজি কার্গো বাংলাদেশে সরবরাহ করা হয়নি। বেশি দামে এসব কার্গো অন্য দেশে সরবরাহ করেছে সংশ্লিষ্ট বিদেশি কোম্পানিগুলো।
জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এলএনজি কেনার ক্ষেত্রে ডিপিএম পদ্ধতি যথাসম্ভব এড়িয়ে চলতে প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন। এতে এলএনজি পাওয়ার অনিশ্চয়তা যেমন থাকে, তেমনি অনিয়মের সুযোগও তৈরি হতে পারে বলে মনে করছে সরকার।
স্বল্পমেয়াদে বিদ্যুৎ উৎপাদনে গ্যাসের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার। এতে বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকির পরিমাণ কিছুটা বাড়লেও শিল্পে গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো সম্ভব হবে বলে মনে করছে জ্বালানি বিভাগ।
এ ছাড়া আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিট জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের ওপর চাপ কমবে বলে জ্বালানি বিভাগ প্রধানমন্ত্রীকে জানিয়েছে। এতে সামগ্রিক বিদ্যুৎ পরিস্থিতিরও উন্নতি হতে পারে।
২০২৯ সালের মধ্যে জ্বালানি সরবরাহ পরিস্থিতির উন্নতি করতে ভোলায় আবিষ্কৃত গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ জন্য ইতোমধ্যে সম্ভাব্যতা সমীক্ষা করা হয়েছে। পাইপলাইন স্থাপনে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।
জ্বালানি বিভাগ বলছে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক বাজার থেকে উচ্চমূল্যে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে। প্রতিটি এলএনজি কার্গোতে প্রায় ৭৩০ থেকে ৭৫০ কোটি টাকা ব্যয় হচ্ছে। সে তুলনায় ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করতে ৫০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও দীর্ঘমেয়াদে এটি লাভজনক হবে।
এ ছাড়া দেশের ১৫০টি গ্যাসকূপ খনন ও পুনঃখননের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ২০২৯ সালের মধ্যে দেশীয় উৎস থেকে অতিরিক্ত ১ হাজার ৭৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
এলএনজি আমদানিতে মধ্যপ্রাচ্যের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা কমাতে চায় সরকার। এ জন্য মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি এলএনজি সরবরাহ চুক্তির বিষয়ে আলোচনা চলছে। যুক্তরাষ্ট্রের আরও কয়েকটি কোম্পানির সঙ্গেও দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।
জ্বালানি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে মোট ৫ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি গ্যাসের লোড অনুমোদন রয়েছে। এর মধ্যে নিয়মিত ৩ হাজার ২০০ এমএমসিএফডি সরবরাহ করা সম্ভব হলে অধিকাংশ খাত স্বাভাবিকভাবে চলতে পারবে। আর ৩ হাজার ৮০০ এমএমসিএফডি সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে গ্যাসের ঘাটতি থাকবে না।
বর্তমানে দেশে দৈনিক প্রায় ২ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৭৫০ এমএমসিএফডি গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। এর মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনেই প্রায় ১ হাজার ৫৮৫ এমএমসিএফডি গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে।
শিল্প খাতে গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লার ব্যবহার বাড়ানোর সুপারিশ করেছে জ্বালানি বিভাগ। যদিও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের খরচ গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুতের তুলনায় কিছুটা বেশি, তারপরও শিল্পে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করতে বাড়তি খরচ করার পক্ষে মত দিয়েছে বিভাগটি।
এক এমএমসিএফডি গ্যাস থেকে প্রায় ৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায়। পাশাপাশি সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ২০১৮ সালে এলএনজি আমদানি শুরু করে। এর আগে দেশের অভ্যন্তরীণ গ্যাস উৎপাদন দিয়েই চাহিদা মেটানো সম্ভব হতো। ওই সময় দেশের গ্যাসক্ষেত্রগুলো থেকে দৈনিক প্রায় ২ হাজার থেকে ২ হাজার ১০০ এমএমসিএফডি গ্যাস পাওয়া যেত।
পরবর্তীতে গ্যাসের চাহিদা বাড়লেও দেশীয় উৎস থেকে উৎপাদন সে অনুযায়ী বাড়েনি; বরং কমেছে। বর্তমানে দেশের গ্যাসকূপগুলো থেকে প্রায় ১ হাজার ৬০০ এমএমসিএফডি বা তার কাছাকাছি গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদি গ্যাস সংকট মোকাবিলায় ২০২৯ সালের মধ্যে আরও তিনটি ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল (এফএসআরইউ) স্থাপনের পরিকল্পনাও করছে সরকার।
হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া
নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com