কেন থমকে গেল প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর, সামনে যেসব শর্ত
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফর ঘিরে কয়েক সপ্তাহ ধরে ঢাকা ও নয়াদিল্লির মধ্যে কূটনৈতিক যোগাযোগ চলছিল। সফরের সময়সূচি, বৈঠকের বিষয় এবং দ্বিপক্ষীয় আলোচনার সম্ভাব্য এজেন্ডা নিয়েও প্রস্তুতি এগোচ্ছিল। আগস্টের তৃতীয় সপ্তাহে সফর হতে পারে—এমন আলোচনাও ছিল দুই দেশের গণমাধ্যমে।
তবে গত ৫ আগস্ট নয়াদিল্লিতে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের পর পরিস্থিতিতে পরিবর্তন আসে। ঢাকার পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, এমন পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফরের জন্য প্রয়োজনীয় ‘অনুকূল পরিবেশ’ এখনো তৈরি হয়নি।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র এ কে এম শহীদুল করিম গত ১৬ আগস্ট জানান, শেখ হাসিনার প্রকাশ্য বক্তব্যের কারণে সম্ভাব্য ভারত সফরের পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিষয়টি নয়াদিল্লিকেও জানানো হয়েছে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, সফরের আগে দুই দেশের কর্মকর্তাদের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে বেশ কিছু বিষয় এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা চলছিল। কিন্তু শেখ হাসিনার রাজনৈতিক তৎপরতা এবং তাঁকে ঘিরে বাংলাদেশের উদ্বেগ নতুন করে সামনে আসায় সফরের প্রস্তুতিতে জটিলতা তৈরি হয়।
সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলীর মতে, দুই দেশের সম্পর্কের টানাপোড়েন কমাতে শীর্ষ পর্যায়ের সফর গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। তবে এ ধরনের সফরের আগে প্রস্তুতিমূলক আলোচনা ও সমঝোতার অগ্রগতি প্রয়োজন।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রথম ভারত সফরকে ঢাকা কেবল সৌজন্য সফর হিসেবে দেখতে চাইছে না। বরং কয়েকটি স্পর্শকাতর বিষয়ে অগ্রগতিও প্রত্যাশা করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে বিশেষভাবে শেখ হাসিনাসহ ভারতে অবস্থানরত পলাতক আসামিদের প্রত্যর্পণ এবং শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের বাংলাদেশে হস্তান্তরের বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে ভারতে অবস্থান করছেন শেখ হাসিনা। সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে তাঁর প্রকাশ্য রাজনৈতিক বক্তব্যের পর বাংলাদেশ সরকার তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায়।
ঢাকার দৃষ্টিতে, বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক ও বিচারিক বিষয় নিয়ে ভারতের মাটিতে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চলতে থাকা দুই দেশের সম্পর্কের জন্য স্বস্তিদায়ক নয়। ফলে সফরের আগে এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি চায় বাংলাদেশ।
আঞ্চলিক নিরাপত্তা বিশ্লেষক ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের জ্যেষ্ঠ গবেষক ড. মোহাম্মদ আশিক রহমান মনে করেন, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ নিয়ে দুই দেশেই রাজনৈতিক হিসাব-নিকাশ রয়েছে। একই সঙ্গে তাঁকে দেশে ফেরালে সম্ভাব্য রাজনৈতিক অস্থিরতার বিষয়টিও বাংলাদেশের সরকার বিবেচনায় নিতে পারে।
শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের পাশাপাশি ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত চাওয়ার বিষয়টিও ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে ভারতের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে, মামলার আসামিদের বাংলাদেশের বিচারিক প্রক্রিয়ার আওতায় আনার সুযোগ করে দিতে। তবে এ বিষয়ে ভারতের আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া জড়িত থাকায় দ্রুত সমাধান হবে কি না, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
সফর নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হলেও দুই দেশের কূটনৈতিক যোগাযোগ পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী সম্প্রতি বলেছেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর দ্রুত হওয়া উচিত। তাঁর মতে, দুই দেশের শীর্ষ পর্যায়ের বৈঠক ও পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমেই বিদ্যমান সমস্যাগুলোর সমাধানের পথ তৈরি হতে পারে।
গত ১৮ আগস্ট এক অনুষ্ঠানে তিনি জানান, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দিল্লি সফরে গেলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে সর্বোচ্চ সম্মান ও স্মরণীয় সংবর্ধনা দেওয়া হবে।
তবে সাবেক কূটনীতিক সাকিব আলীর মতে, বড় ধরনের আনুষ্ঠানিক সংবর্ধনার চেয়ে বাংলাদেশের জন্য পানি, সীমান্ত, বাণিজ্য, শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ এবং বিভিন্ন মামলার আসামিদের হস্তান্তরের মতো বিষয় বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক স্থিতিশীল রাখা ভারতের জন্যও কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই দেশের দীর্ঘ সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ, নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্বার্থ পরস্পরের সঙ্গে জড়িত।
তবে শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ ইস্যুতে ভারতের আইনি ও কূটনৈতিক নানা বিষয় বিবেচনায় নিতে হচ্ছে। ফলে ঢাকার প্রত্যাশা অনুযায়ী দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া দিল্লির জন্য কতটা সম্ভব হবে, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বর্তমান পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ভারত সফর বাতিল হয়নি; বরং আপাতত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। সরকারের বক্তব্যে ‘অনুকূল পরিবেশ’ তৈরির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ পরিস্থিতি অনুকূলে এলে সফরের প্রস্তুতি আবারও শুরু হতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, এখন অনেকটাই নির্ভর করছে নয়াদিল্লির পরবর্তী পদক্ষেপের ওপর। ভারত যদি বাংলাদেশের উদ্বেগগুলো নিয়ে ইতিবাচক বার্তা দেয় এবং প্রত্যর্পণ ও বিচারসংক্রান্ত বিষয়গুলোতে দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখায়, তাহলে স্থবির হয়ে থাকা সফরের প্রস্তুতি আবার গতি পেতে পারে।
দুই দেশের সম্পর্ককে সামনে এগিয়ে নিতে পারস্পরিক স্বার্থ, সমতা ও শ্রদ্ধার ভিত্তিতে সরাসরি আলোচনা জরুরি বলে মনে করছেন কূটনীতিক ও বিশ্লেষকেরা।
হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া
নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com