নাসিরনগরে সার ডিলার নিয়োগে এমপির স্বজনদের নাম, উঠল অভিযোগ
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে সারের নতুন ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর স্বজনপ্রীতি ও অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ (নাসিরনগর) আসনের সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির সভাপতি এম এ হান্নানের ছেলে, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার স্ত্রীও নতুন ডিলার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার কার্যালয় ও প্রকাশিত তালিকা সূত্রে জানা গেছে, নাসিরনগরের ১৩টি ইউনিয়নের প্রতিটিতে একজন করে মোট ১৩ জনকে সারের ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তালিকায় সংসদ সদস্যের স্বজনদের নাম আসায় স্থানীয় বিএনপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে সমালোচনা চলছে।
স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতার দাবি, গোকর্ণ ইউনিয়নে ডিলার হিসেবে নিয়োগ পাওয়া মোহাম্মদ আদনান সাদী সংসদ সদস্য এম এ হান্নানের ছেলে। গোয়ালনগর ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া নুরুন্নাহার আক্তার তাঁর ভাগিনা শরীফুল ইসলামের স্ত্রী। আর সদর ইউনিয়নের আরক মিয়া তাঁর ভগ্নিপতি বলে দাবি করা হয়েছে।
স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, আরক মিয়া নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের উপজেলা কমিটির সাবেক সভাপতি আসাদ চৌধুরীর ভাই। এ ছাড়া শরীফুল ইসলাম আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গোয়ালনগর থেকে চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার পরিকল্পনা করছেন বলে দাবি করেছেন স্থানীয় বিএনপির কয়েকজন নেতা। তাঁদের অভিযোগ, রাজনৈতিক পরিকল্পনার অংশ হিসেবেই তাঁর স্ত্রীর নামে ডিলারশিপ নেওয়া হয়েছে। তবে এ দাবির স্বাধীন যাচাই পাওয়া যায়নি।
নুরুন্নাহারের শ্বশুর সাদেক মিয়া চাতলপাড় ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
ডিলার নিয়োগের তালিকা প্রকাশের পর ফেসবুকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা-কর্মী সমালোচনা করেছেন। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক সাজিদুর রহমান তাঁর পোস্টে রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন তোলেন এবং অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ সামনে আনার আহ্বান জানান।
গুনিয়াউক ইউনিয়ন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমিনুল ইসলামও ডিলার নিয়োগে রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে অন্য বিষয় প্রাধান্য পাওয়ার অভিযোগ তুলে পোস্ট দেন।
স্থানীয় বিএনপির একাংশের অভিযোগ, দলের দীর্ঘদিনের নেতা-কর্মীরা ডিলারশিপ পাননি। তবে নিয়োগপ্রাপ্তদের যোগ্যতা ও আবেদনকারীদের তুলনামূলক মূল্যায়নসংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ নথি ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
স্বজনদের নিয়োগে অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন সংসদ সদস্য এম এ হান্নান। তাঁর বক্তব্য, সরকারি আইন ও বিধি মেনেই তাঁর ছেলে, ভগ্নিপতি এবং ভাগিনার স্ত্রী ডিলারশিপ পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট তিনটি ইউনিয়নে তাঁদের মতে যোগ্য অন্য আবেদনকারীও ছিলেন না বলে তিনি দাবি করেন।
অর্থের বিনিময়ে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং গুজব। তাঁর ভাষ্য, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ সত্য নয়।
নতুন তালিকার আরও কয়েকজনকে নিয়ে স্থানীয়ভাবে আলোচনা চলছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, বুড়িশ্বরের জসিম মিয়ার সঙ্গে আগে যুবলীগের রাজনীতির সংশ্লিষ্টতা ছিল। তিনি উপজেলা যুবলীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মোজাম্মেল হক ওরফে দানা মিয়ার ভাগিনা বলেও দাবি করা হয়েছে।
কুন্ডা ইউনিয়নে নিয়োগ পাওয়া রেনু মিয়া স্থানীয় যুবদল সভাপতি অনু মিয়ার ভাই। স্থানীয় সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, অনু মিয়ার আগের ডিলারশিপ বাতিল হওয়ার পর তাঁর ভাই নতুন করে নিয়োগ পেয়েছেন।
ফান্দাউক ইউনিয়নের শারমীন আক্তার যুবদল সভাপতি ফয়েজ আনসারির স্ত্রী বলে জানা গেছে। চাতলপাড়ের শামীমা আক্তারের স্বামী আলমগীর হোসেনের রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন নেতা। তাঁদের দাবি, ২০২৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের পক্ষে কাজ করার কারণে আলমগীরকে উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদকের পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। অন্যদিকে হরিপুরের আরিফুল ইসলাম ঢাকায় আসবাবপত্রের ব্যবসা করেন বলে স্থানীয় সূত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।
এসব ব্যক্তির রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা বা পারিবারিক সম্পর্ক থাকলেই নিয়োগে অনিয়ম প্রমাণিত হয় না। নিয়োগের শর্ত, যোগ্যতা ও বাছাইয়ের নথি পর্যালোচনা করেই অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের বিধিমালা অনুযায়ী, সার ডিলার হিসেবে নিয়োগের ক্ষেত্রে আবেদনকারীর গুদামের ধারণক্ষমতা ও নির্ধারিত অবকাঠামোগত শর্ত পূরণের বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্ট বিধির বর্ণনা অনুযায়ী, কমপক্ষে ২৫ টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হয়; এর দৈর্ঘ্য ২০ ফুট, প্রস্থ ১৫ ফুট এবং উচ্চতা ১০ ফুট হওয়ার কথা।
তবে নাসিরনগরে নতুন নিয়োগ পাওয়া কয়েকজন ডিলার এই শর্ত পূরণ করেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। এ বিষয়ে সরেজমিন পরিদর্শন বা সরকারি যাচাই প্রতিবেদনের তথ্য পাওয়া গেলে অভিযোগের সত্যতা আরও স্পষ্ট হবে।
স্থানীয় ছাত্রদল, যুবদল ও বিএনপির অন্তত ২০ জন নেতা-কর্মীর সঙ্গে কথা বলার দাবি করা হয়েছে মূল প্রতিবেদনে। তাঁদের মধ্যে কয়েকজনের অভিযোগ, দলের ত্যাগী নেতা-কর্মীরা তালিকায় স্থান পাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন নেতা অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার কথা শুনেছেন বলেও দাবি করেছেন। তবে এসব বক্তব্য অভিযোগ ও শোনা কথার ভিত্তিতে দেওয়া; স্বাধীনভাবে নিশ্চিত কোনো প্রমাণ এখানে উপস্থাপিত হয়নি।
নাসিরনগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ইমরান হোসাইন জানিয়েছেন, আবেদনকারীদের যাচাই-বাছাই করে একটি তালিকা জেলা পর্যায়ে পাঠানো হয়েছিল। পরবর্তী পর্যায়ে কীভাবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত জানেন না বলে জানান।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোস্তফা এমরান এ বিষয়ে মন্তব্য করতে সীমাবদ্ধতা প্রকাশ করেন। তিনি বলেন, সরকারি চাকরির দায়িত্বের মধ্যে থেকে এ বিষয়ে তাঁর বেশি কিছু বলার নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ১০১টি ইউনিয়ন ও পাঁচটি পৌরসভায় মোট ১০৬টি সার ডিলারশিপের বিপরীতে ৮২৫ জন আবেদন করেছিলেন।
জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রতিটি ইউনিয়নের জন্য অগ্রাধিকারভিত্তিতে তিনজন করে প্রার্থীর নাম সুপারিশ করে কেন্দ্রীয় সার ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠায়। পরে সেখান থেকে মোট ২৯২ জনের আবেদন সুপারিশ করা হয় বলে সূত্রটি জানিয়েছে।
নাসিরনগরে ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে আবেদনকারীদের যোগ্যতা, গুদাম পরিদর্শনের প্রতিবেদন, বাছাইয়ের মানদণ্ড এবং চূড়ান্ত অনুমোদনের নথি যাচাই করা প্রয়োজন। এসব তথ্য প্রকাশ্যে এলে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বজনপ্রীতি বা অন্য কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না, তা নির্ধারণ করা সহজ হবে।
হাউজ# ১৩, মেইন রোড, ব্লক-সি, বনশ্রী, রামপুরা, ঢাকা-১২১৯।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মোঃ ইয়াছিন মিয়া
নিউজ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
বিজ্ঞাপণ
ফোনঃ +880 1975681488
Email: sobarkothabdnews@gmail.com
২০২৬ সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত || sobarkotha.com