ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার, ২০২০ || ১৩ আশ্বিন ১৪২৭
 নিউজ আপডেট:

আমাদের দেশের রাজনীতি এখন মার্কাতেই আটকে আছেঃমোহাম্মদ হাসান

ক্যাটাগরি : রাজনীতি প্রকাশিত: ৩৬৩ঘণ্টা পূর্বে   ১০৭


আমাদের দেশের রাজনীতি এখন মার্কাতেই আটকে আছেঃমোহাম্মদ হাসান

আমাদের দেশের রাজনীতি এখন মার্কাতেই আটকে আছে। জাতীয় স্থানীয় নির্বাচনে মার্কার বিজয় হবে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে মার্কাকে প্রাধান্য দেয়ার আড়ালে রাজনীতি ক্রমাগতভাবে রাজনীতিকদের হাতছাড়া হচ্ছে। বিক্রি হয়ে যাচ্ছে অর্থের কাছে। আমলা আর ব্যবসায়ীরা ভুঁইফোড় রাজনীতিক হচ্ছেন আর বিপন্ন করে তুলছেন গণতান্ত্রিক কাঠামোকে।


মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ২০১৮ সালে  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫১তম সমাবর্তন অনুষ্ঠানে বলেছেন- রাজনীতি এখন গরিবের বউ, যে সবার ভাউজ মানে ভাবি। কথাটি অপ্রিয় হলেও ১০০ ভাগ সত্য।


কারণ দেশে সব পেশার ক্ষেত্রেই নিয়মনীতি ও বিধিবিধান আছে, যোগ্যতার প্রশ্ন আছে; কিন্তু রাজনীতি করতে গেলে কোনো যোগ্যতা, বিধিবিধান ও নিয়মনীতি লাগে না। টাকাওয়ালা হলেই সে বিরাট রাজনীতিবিদ। এমনকি সে এমপি-মন্ত্রীও হয়ে যাচ্ছে হরহামেশাই, যা রাজনীতির জন্য তো বটেই; দেশের জন্যও বিপজ্জনক।


তাই দেশে আজ প্রকৃত রাজনীতিবিদ গড়ে উঠছে না। রাজনীতিবিদ গড়ে না ওঠায় দেশের কথাও কেউ ভাবছে না, জনগণের কথাও কেউ ভাবছে না। সবাই টাকা ইনকামের ধান্ধায় আছে। টাকা হলেই সব হবে- এ ভাবনায় তারা বুদ হয়ে আছে।


দেখা যাচ্ছে- রাজনীতি এখন আর রাজনীবিদদের হাতে নেই। রাজনীতি চলে গেছে ব্যবসায়ী, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি আমলা এবং বিদেশ ফেরতসহ অন্যান্য পেশাজীবীর হাতে। এ চিত্র প্রত্যক্ষ করে সেদিন মহামান্য রাষ্ট্রপতি স্বাভাবিকভাবেই উম্মা প্রকাশ করেছেন।


আমাদের রাজনীতিকগণ নির্বাচনী গণতন্ত্রকেও এমন জায়গায় নিয়ে গেছেন যে সেখানে ব্যক্তি ইমেজের কোনো মূল্য নেই। তৃণমূলের পোড়খাওয়া সৎ রাজনীতিক ভোটারের কাছে ঠিক মূল্যায়নই পেতেন। কিন্তু অর্থ-বিত্ত আর পেশিশক্তি ছাড়া যোগ্যতার মানদণ্ডে তারা হেরে যাচ্ছেন।


এর সঙ্গে এখন যোগ হচ্ছে সেলিব্রেটি ইমেজ। রাজনীতির সঙ্গে কোনো অতীত যোগাযোগ নেই। সুখে-দুঃখে দলকে এগিয়ে নেয়ায় কোনো ভূমিকা কখন রাখেননি তেমন খেলোয়াড়, চিত্রজগতের মানুষ, সঙ্গীতশিল্পী সবাই মনোনয়নের দৌড়ে আছেন।


তারা মনোনয়ন পেলে নির্বাচনী এলাকার দীর্ঘদিন রাজনীতি করা নেতারা নিজেরাই শুধু ফুটো বেলুনের মতো চুপসে যাবেন না, এলাকার মানুষও হতাশ হবেন। তরুণ ভোটারদের একটি অংশের ভোট হয়তো সেলিব্রেটি ইমেজের কারণে তারা পেতে পারেন। অন্য ভোটারের মন কি আমরা জানতে চেয়েছি?


রাজনীতির পথ কখনই ফুলের পাপড়ি বিছানো নয়। দেশি-বিদেশি প্রখর ও নিবিড়, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ দৃষ্টির গোচরে থেকেই রাজনীতির পথে হাঁটতে হয়। দেশি-বিদেশি প্রখর ষড়যন্ত্রমূলক কূটচাল মোকাবেলা করেই হাঁটতে হয়; প্রাসাদ ষড়যন্ত্র বা দীনকুটিরের ষড়যন্ত্র এবং গৃহবিবাদ মোকাবেলা করেই হাঁটতে হয়; কোনো কোনো সময় কৌশলের অংশ হিসেবে অথবা নিজের রাজনৈতিক পথের সুরক্ষার জন্য পথ বদলাতে হয়। 


রাজনীতির অঙ্গনে নেতৃত্বের জন্য নীরব প্রতিযোগিতা বা রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যক্তিত্বের সঙ্ঘাত (ইংরেজি পরিভাষায় ‘পার্সোনালিটি ক্ল্যাশ’) যুগে যুগে হয়ে এসেছে, বর্তমানেও দৃশ্যমান এবং ভবিষ্যতেও হবে, এটা মনে রেখেই রাজনীতির পথে হাঁটতে হয়। এরূপ প্রেক্ষাপটেই একজন রাজনৈতিক নেতা বা কর্মীকে নিজ স্বচ্ছতা উজ্জ্বল রাখতে হবে। এই চেষ্টা কারো জন্য সহজ ও প্রিয় হবে; আবার কারো জন্য কঠিন ও অপ্রিয় হবে। এ রকম পরিস্থিতিতে যেকোনো পদক্ষেপই সাধারণ নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে গভীর পর্যবেক্ষণ ও গভীর দৃষ্টি আকর্ষণ করবে; রাজনীতিমনস্ক আগ্রহী ব্যক্তিদের অনেকেরই সন্দেহের সৃষ্টি করবে। নতুন কোনো রাজনৈতিক পথের সূচনায় অনেকেই উৎফুল্ল হবেন, অনেকেই হবেন আতঙ্কিত। 


একজন কলাম লেখকের বা একজন দূরদর্শী রাজনৈতিক কর্মীর জন্য এসব বিষয়ে নজর রাখা সবিশেষ কঠিন নয়। এত কথা বলার পেছনে কারণ, এখন সময়টি গুরুত্বপূর্ণ যাচ্ছে, সময়টি সঙ্কটপূর্ণ যাচ্ছে, সময়টি স্পর্শকাতর যাচ্ছে। সঠিক বুঝতে না পারলেও ভুল বোঝার জন্য রাস্তা খোলা; ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ উন্মুক্ত। যেকোনো আলাপে, সংলাপে, আলোচনায়, পাঠ-উদ্ধারে, সঠিক মর্ম হৃদয়ঙ্গম করতে বা সঠিক বক্তব্য বুঝতে সময় লাগে, কষ্ট হয়। কিন্তু ভুল বুঝতে একদম সময় লাগে না, চটজলদি ভুল বোঝাবুঝি হয়েই যায়। 


ফেসবুক বা ভার্চুয়াল জগতের আবির্ভাবের সাথে সাথে মানুষের ধৈর্য কমে যাচ্ছে। কারণ, তাৎক্ষণিক মন্তব্য দেয়ার প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন সময়টি প্রতিশ্রুতিময়। আমরা যদি সঙ্কট থেকে উত্তরণ ঘটাতে চাই, আমরা যদি লুক্কায়িত সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে চাই, আমরা যদি প্রতিশ্রুতিকে ফলপ্রসূ করতে চাই, তাহলে চিন্তায় সমন্বয় ও সংহতি প্রয়োজন। 

লেখকঃ মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন: