ঢাকা, ২৬ নভেম্বর বৃহস্পতিবার, ২০২০ || ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৭
 নিউজ আপডেট:

রাজনীতি,শিষ্টাচার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা: মোহাম্মদ হাসান

ক্যাটাগরি : মুক্তমত প্রকাশিত: ৭৬৩ঘণ্টা পূর্বে   ৭৫


রাজনীতি,শিষ্টাচার ও সামাজিক দায়বদ্ধতা: মোহাম্মদ হাসান

শিষ্টাচার কি সমাজ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে ? শিষ্টাচার কি জীবন থেকে চলে গেছে? একেবারে চলে গেছে বলা ঠিক হবে না। এখনও শিষ্টাচার আছে বলে সমাজ আছে। রাজনীতি থেকে নির্বাসনে যাচ্ছে শিষ্টাচার, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌজন্য। একই সঙ্গে সামাজিক মূল্যবোধও কমছে। এক দলের নেতার সঙ্গে আরেক দলের নেতানেত্রীর এখন আর আগের মত হৃদ্যতা নেই। একে অপরের প্রতি সম্মান, ন্যূনতম সৌজন্যও দেখান না তারা। এমনকি নিজ দলের মধ্যে ও ন্যূনতম সৌজন্যও দেখান না রাজনীতিতে শিষ্টাচার একটি শব্দ আছে যখনই রাজনৈতিক শিষ্টাচার নষ্ট হয়ে যায় তখনই রাজনীতিতে কাল ঘনঘটা দেখা যায়।


রাজনীতিতে বিস্তর মতপার্থক্য থাকলেও অতীতে রাজনীতিবিদদের পরষ্পরের প্রতি শ্রদ্ধা ও শিষ্টাচার লক্ষ্য করা যেত। তারা ভিন্নমতকে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও গণতান্ত্রিক অধিকার হিসেবেই বিবেচনা করতেন। কখনো তা ব্যক্তিগত আক্রোশ বা প্রতিহিংসার পর্যায়ে যেত না। প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে অহেতুক খিস্তিখেউর করতে কাউকে দেখা যায় নি অতীতে।


একসময় রাজনীতির মঞ্চে একে অপরের বিরুদ্ধে কাঁদা ছোড়াছুড়ি কিংবা জ্বালাময়ী বক্তৃতা দিলেও দিনশেষে একজায়গায় বসে চায়ের আড্ডায় মেতে ওঠতেন সবাই। বক্তৃতা দিয়ে মঞ্চের নীচে এসে একে অন্যের সাথে হাত মেলাতেন। সুখ, দুঃখের খোঁজখবর নিতেন একে অন্যের। একদলের নেতারা অন্যদলের নেতাদের বাড়িতে সামাজিক আচার অনুষ্ঠানগুলোতে অংশগ্রহণ করতেন। এগুলো নব্বই দশকের আগের কথা। রাজনীতিতে হয়তো এমন স্বর্ণালী যুগ আর কখনও দেখা যাবে না।


আমরা যখন নব্বই দশকে ছাত্র রাজনীতি করি (১৯৯১-২০০১), তখনও রাজনীতির মাঠে একে অন্যের প্রতি অনেক সহমর্মীতা ছিল। তবে নিজদলের মধ্যে সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ ছিল খুবই চমৎকার। দলের এককর্মীর কিছু হলে অন্যরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিবাদ করতাম। তেতুলিয়ায় কোন এক কর্মী আহত হলে টেকনাফে মিছিল হতো।


এখন নিজদলের কাছেই নিরাপদ নয় কর্মীরা। বিগত এগার বছর যাবত আওয়ামীলীগ ক্ষমতায়। কিন্তু এই এগার বছরে আমার জানামতে সারাদেশে আওয়ামীলীগের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে যত মামলা হয়েছে, বেশিরভাগ মামলার বাদী নিজদলের লোকজন। একই সময়ে হামলা বা রক্তারক্তির ঘটনাগুলোও ঘটেছে নিজদলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলের কারণে। এসব বিরোধ মিমাংসা করতে দলের দায়িত্বশীল নেতাদের কোনো উদ্যোগী ভূমিকা নেই। অথচ, একসময় দল ক্ষমতা থেকে চলে গেলে নিজেদের দেওয়া মামলায় নিজেরাই বেশি হয়রানির শিকার হবে।


প্রাসঙ্গিকভাবেই যেকোন মূল্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা নিজদলের ভাই নামে কথিত অসুর বধই হয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতির প্রধান উপজীব্য। "ধরি মারি পারি যে কৌশলে" এই হয়েছে আমাদের দেশের রাজনীতির উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য। ফলে দেশে সুস্থ্যধারার রাজনীতি সরল রেখাটা ক্রমেই বক্র হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থার কোন উন্নতি দৃশ্যত লক্ষ্য করা যাচ্ছে না বরং দিন যতই যাচ্ছে ততই পরিস্থিতির অবনতি ঘটছে।


রাজনৈতিক সংস্কৃতির যথাযথ চর্চার অভাব, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অশ্রদ্ধার কারণেই আমাদের দেশের রাজনীতি এখন রীতিমত সমস্যাসঙ্কুল হয়ে উঠেছে। আর আগামী দিনে এই পরিস্থিতি আরও বাড়বে একথা বলার যৌক্তিকতাও দৃশ্যমান।


রাজনীতির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে রাষ্ট্র ক্ষমতা অর্জন ও ক্ষমতাচর্চার মাধ্যমে গণমানুষের কল্যাণ সাধন। রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। যার কাঙ্খিত লক্ষ্য হচ্ছে আর্তমানবতার কল্যাণ।


মূলত সামাজিক এককগুলোর সেতুবন্ধনের বৃহত্তর ও পরিশীলিত রূপই হচ্ছে রাষ্ট্র। রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে শিক্ষার এমন একটি শাখা যা রাজনৈতিক আচরণ শেখায় এবং ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে একটি গতিশীল ও যুতসই নির্দেশনা দেয়। রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় প্লেটোর "রিপাবলিক", এরিস্টটলের "রাজনীতি" এবং কনফুসিয়াসের কিছু লেখনীতে। যা আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার পথ নির্দেশক হিসেবে মনে করা হয়।


রাজনীতি একটি সেবামূলক কাজ। রাজনীতির মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য হচ্ছে একটি নির্দিষ্ট আদর্শের ভিত্তিতে কিছু সংখ্যক লোককে সংগঠিত করে রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জনের মাধ্যমে মানুষের কল্যাণ সাধন। রাজনৈতিক মঞ্চের বক্তারা সব সময় এ কথাই বলে থাকেন যে, তারা ক্ষমতায় গেলেই শুধু জনগণের কাছে প্রতিশ্রুত কল্যাণ সাধনে আত্মনিয়োগ করবেন। আর তারা জনগণের কাছে যেসব প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকেন, সেসবের বেশির ভাগই রাষ্ট্রক্ষমতার সাথে সংশ্লিষ্ট। তাই জনগণের কাছে দেয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষার জন্য রাজনৈতিক শক্তিগুলোর জন্য ক্ষমতা যাওয়া অপরিহার্য হয়ে ওঠে। আর জনগণ যাদের নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় পাঠায় তাদের রাজনৈতিক দায়বদ্ধতার সাথে সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতাও এসে যায়। যদিও কোনো রাজনৈতিক শক্তিই সামাজিক এই দায়বদ্ধতা থেকে মুক্ত নয়। কিন্তু ক্ষমতাবান আর ক্ষমতাহীন রাজনৈতিক শক্তিকে একই তুলনাদণ্ডে তুলনা করা যৌক্তিক বলে মনে হয় না।


রাজনীতি আর সমাজনীতি একে অপরের পরিপূরক হলেও উভয় ক্ষেত্রের দায়বদ্ধতার পরিসর এক ও অভিন্ন নয়। এমনকি সামাজিক দায়বদ্ধতার বিষয়টি কোনো ক্ষেত্রেই শর্তহীনও বলা যাবে না। তাই রাষ্ট্র, সরকার ও রাজনীতির সাথে সামাজিক দায়বদ্ধতার স্বরূপ কী সেই বিষয়েই প্রথমে আলোচনা হওয়া দরকার। একথা বললে অত্যুক্তি হওয়ার কথা নয় যে, সামাজিক দায়বদ্ধতা হলো এক ধরনের ব্যবসায়িক শিষ্টাচার বা নীতি- যা সমাজের প্রতি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব পালনকে ব্যবসায়ের নিয়েমের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করে। যে পরিবেশে বা যে সমাজে একটি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন গড়ে ওঠে, সেই সমাজের প্রতি প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের কিছু দায়বদ্ধতা সৃষ্টি হয়। বর্তমান সময়ে বেশির ভাগ বড় ব্যবসায় প্রতিষ্ঠানই সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে সমাজের বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে অংশ নিচ্ছে এবং তাদের শেয়ার মালিকদের লভ্যাংশের কিছু অংশ এই খাতে বরাদ্দ রাখছে। কিন্তু রাজনীতি কোনো ব্যবসায় নয়, বরং একটি সেবামূলক কাজ।


যদিও আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে রাজনীতির এখন বাণিজ্যিকায়ন হয়েছে। আমাদের সংসদে ব্যবসায়ীদের প্রতিনিধিত্বের হার বেড়ে যাওয়ার সাথে তাদের কারো কারো অন্যায় প্রভাব বিস্তারের বিষয়টিও উপেক্ষা করার মতো নয়। প্রবৃদ্ধির রাজনীতিতে রাজনীতিকদের চেয়ে ব্যবসায়ীদের প্রাধান্য এখন অনেক বেশি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের হিসাবে আমাদের দশম জাতীয় সংসদে ব্যবসায়ী ছিলেন ৫৯ শতাংশ। সুজনের হিসাবে একাদশ সংসদে তা বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬২ শতাংশ। সংসদে এবং সংসদের বাইরে বিরোধী দলে ব্যবসায়ী রাজনীতিকদের সংখ্যা নেহাত কম নয়। তবে এ ক্ষেত্রে ক্ষমতাসীনরাই অনেকটাই এগিয়ে।


আজ শুধু রাজনীতি নয় বরং সমাজের সভ্য হিসেবে আমরা কেউই সামাজিক দায় থেকে মুক্ত নই। তবে যারা রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকেন তাদের দায়টা অন্যদের চেয়ে অনেক বেশি। কারণ, ক্ষমতাসীনদের হাতেই থাকে সমাজ-রাষ্ট্রের সব কিছুরই নিয়ন্ত্রণ। যেহেতু রাজনীতি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়, তাই রাজনীতির পাত্রমিত্ররাও সামাজিক দায় থেকে মুক্ত থাকতে পারেন না। সামাজিক দায়বদ্ধতার অংশ হিসেবে প্রত্যেকের যেমন কিছু দায়িত্ব রয়েছে, তেমনি সে দায়িত্ব পালনের জন্য একটা উপযুক্ত পরিবেশও জরুরি। আর সে পরিবেশ সৃষ্টি এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনকে নির্বিঘ্ন করার দায়িত্ব রাষ্ট্রের বা সরকারের। মূলত কোন সমাজরাষ্ট্রে সুন্দর ও সুকুমার বৃত্তির চর্চা অবারিত করতে হলে সে সমাজে গণতন্ত্র, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, আইন ও সাংবিধানিক শাসন নিশ্চিত হওয়া জরুরি। কারণ, গণতন্ত্র ও সুশাসনহীন সমাজে সুকৃতির চর্চা কখনোই সফল ও সার্থক হয়ে ওঠে না।


লেখকঃ মোহাম্মদ হাসান, সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন: