ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার, ২০২০ || ১৩ আশ্বিন ১৪২৭
 নিউজ আপডেট:

বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে জটিলতাটা কোথায়?

ক্যাটাগরি : মুক্তমত প্রকাশিত: ৩০৩ঘণ্টা পূর্বে   ২৬২


বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে জটিলতাটা কোথায়?

আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, যেখানে করোনা শুরু হওয়ার আগে যুবক যুবতীদের মধ্যে গড়ে শতকরা ১২ জন বেকার ছিল। যা এখন বেড়ে শতকরা প্রায় ২৫ জনে (২৪ দশমিক ৮ শতাংশ) পরিনত হয়েছে। ২০১৯ সালের তথ্যমতে যা ছিল ১১ দশমিক ৯ শতাংশ। অর্থাথ আইএলও প্রতিবেদন বিশ্লেষন অনুযায়ী করোনায় বাংলাদেশে বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হয়েছে। 
করোনা কালীন সময়ে বাংলাদেশে যুবকদের বেকারত্বের হার দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ার পেছনে অনেকে ব্যবসা-বাণিজ্যে ভাটা পড়া, কোম্পানিগুলো জনবল ছাটাই করা, বেসরকারী পর্যায়ে নতুন চাকরির সুযোগ বেশ সীমিত হয়ে যাওয়াকে এক পাক্ষিক ভাবে দায়ি করছেন। ফলে বেকারত্বের প্রকৃত কারনটি আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। 
বাংলাদেশের পরিকল্পনা কমিশনের হিসাবে, দেশে প্রতিবছর গড়ে ১৮ লাখ যুবক যুবতী শ্রমবাজারে আসেন। যার মধ্যে ছয় থেকে সাত লাখ যুবক যুবতী প্রবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে চাকরিতে যোগদান করেন। বাকি প্রায় বার লাখ চাকুরি প্রার্থীকে অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে লড়াই করতে হয়। সাম্প্রতিক করোনা পরিস্থিতির কারণে প্রবাসী শ্রমিকেরা স্থায়ী ভাবে দেশে ফিরে আসায় বেকারত্বে এই মিছিল যেন আকাশ ছুয়েছে। নতুন চাকরি প্রত্যাশীদের শ্রমশক্তিতে যুক্ত হওয়ার ঝুকি আরো বেড়ে গেছে। শ্রমশক্তি গবেষনার আলোকে এটা সুস্পষ্ট যে, এই বেকারের সংখ্যা আগামীতে আরও বাড়বে।
এসব কারনে আজ বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে জটিলতাটা কোথায় সেটা জানা জরুরী হয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস)  শ্রমশক্তি জরিপ- ২০১৬-১৭ অনুযায়ী, দেশের শ্রমশক্তিতে নিয়োজিত আছেন ৬ কোটি ৩৫ লাখ জনগন। এর মধ্যে ১৫ থেকে ২৯ বয়সী সংখ্যা ২ কোটি ৮৩ হাজার। তাঁদের মধ্যে কর্মজীবী ১ কোটি ৭৯ লাখ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসেবে দেশে ওই সময়ে বেকার ছিল ২৭ লাখ। পরিসংখ্যান ব্যুরোর এই জরিপে বেকারের সজ্ঞা ও সংখ্যা নিয়ে তৎকালীন সময়ে প্রচুর সমালোচনা হয়েছিল। বিশ্লেষকদের মতে সেসময় দেশে প্রকৃত বেকারের সংখ্যা ছিল দুই কোটি।
গত ২৯ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য মতে সরকারি চাকরিতে বর্তমানে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৮টি পদ ফাঁকা পড়ে আছে, যা মোট পদের ২১ দশমিক ২৭ শতাংশ। অথচ ২০১৩ সালে সরকারি চাকরিতে মোট পদের ১৮ দশমিক ৮০ শতাংশ পদ ফাঁকা ছিল।  অপর আর একটি হিসেব থেকে জানা যায়, সরকারি চাকরিতে ১৮ লাখ ২১ হাজার ২৮৪টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে ১৪ লাখ ৩৩ হাজার ৯৪৬ জন কর্মরত আছেন এবং শুণ্য পদ রয়েছে ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৮টি পদ।
সরকারী পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষন করলেই দেখা যায় সরকারি চাকরিতে শুণ্য পদের সংখ্যা প্রতি বছর বেড়েই চলেছে। শূন্যপদ পূরণে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কিছু নির্দেশনা থাকলেও সংশ্লিষ্ট বিভাগ ও প্রতিষ্ঠান গুলোর তৎপরতা খুব বেশি চোখে পড়ে না। কয়েকটা মন্ত্রণালয় ও বিভাগ জনবল নিয়োগের কিছু বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করতে হচ্ছে। বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) এখনো জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াটিকে সহজ করতে পারেনি। অথচ এই  প্রতিষ্ঠানটির মাধ্যমে প্রধানত বিসিএস ক্যাডার ও নন-ক্যাডার পদের লোকবল নিয়োগ দেওয়া হয়। আর এসব পদে নিয়োগ দিতে বিজ্ঞপ্তি জারির পর, নিয়োগ সম্পন্ন হতে তিন বছরের বেশি সময়ও লেগে যায়।

দেশে শিক্ষার হার বেড়েছে। সেই সাথে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করা যখন শিক্ষার অন্যতম প্রধান উদ্দেশ্য হয় তখন বেকারত্বের এই বোঝা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। আমাদের শিক্ষাকে কতটা মানসম্মত বা যুগোপযোগী আজ সে আলোচনার চাইতে গুরুতর হয়ে উঠেছে বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে রাষ্ট্রের ভুমিকার প্রশ্নটি। 
কালোটাকা সাদা করার সুযোগ, অর্থ পাচার, লুটপাট, অনুৎপাদনশীল খাতে বিনিয়োগ প্রভৃতি কারনে দেশের অর্থনীতি বারবার ঝুকির মুখে পড়েছে। এরপরও সরকারী পর্যায় থেকে বার বার আত্বকর্মসংস্থানের কথা বলা হচ্ছে। নিশ্বন্দেহে আত্বকর্মসংস্থান জাতির কল্যানে ভুমিকা রাখবে। কিন্ত ৩ লাখ ৮৭ হাজার ৩৩৮টি পদ ফাঁকা রেখে বার বার আত্বকর্মসংস্থানের বিজ্ঞাপন জারি করার পেছনের কারন উদঘাটনও আজ সময়ের দাবি।

লেখক : চৌধুরী জোসেন
প্রচার ও প্রকাশনা বিষয়ক সম্পাদক
বাংলাদেশ যুব ইউনিয়ন, কেন্দ্রীয় কমিটি

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন: