ঢাকা, ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার, ২০২০ || ১৩ আশ্বিন ১৪২৭
 নিউজ আপডেট:

ঘুষ-দুর্নীতির ‘রসের হাঁড়ি’ শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন ভূমি অফিস

ক্যাটাগরি : বাংলাদেশ প্রকাশিত: ৩০০ঘণ্টা পূর্বে   ৪১


ঘুষ-দুর্নীতির ‘রসের হাঁড়ি’ শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন ভূমি অফিস

 


শাবজল হোসাইন: ইউনিয়ন ভূমি অফিসের অসৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতি ও স্বেচ্ছাচারিতার কারণে ভূমি খাত দুর্নীতির বিষবৃক্ষে পরিণত হয়েছে। কতিপয় অসাধু কর্মকর্তার লোভ-লালসার কারণে ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রত্যাকটি চৌকাঠ পর্যন্ত দুর্নীতি ছড়িয়ে পড়েছে। লাগামহীন দুর্নীতি চলছে তাহিরপুর উপজেলার গোটা ভূমি খাতে। জানা গেছে, এ খাতে খাজনা আদায়, জমি রেজিস্ট্রেশন, নামজারি, জমির শ্রেণি পরিবর্তন, ভূমি অধিগ্রহণে চেক জালিয়াতি, নীতিমালা ভঙ্গ করে জমি বরাদ্দ দেওয়া, জলমহাল ইজারাসহ নানা ক্ষেত্রে অবাধ দুর্নীতি রয়েছে। কর্তৃপক্ষের অবহেলা, উদাসীনতা ও দুর্নীতিপরায়ণ মানসিকতার কারণে জনসম্পৃক্ত অতিগুরুত্বপূর্ণ এই খাতের ভাবমূর্তি দারুণভাবে ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।

সুনামগঞ্জের তাহিরপুর উপজেলার ভূমি অফিস ঘুষ-দুর্নীতির ‘রসের হাঁড়ি'তে পরিনত হয়েছে। উপজেলার ১নং শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন ভূমি অফিস। জমির কর দিতে অফিসের সামনে ও ভিতরে গিজগিজ করছেন সেবাপ্রার্থীরা। কিন্তু জমির মূল্যের চেয়ে বেশী কর দাবী করায় ক্ষোভ নিয়ে বেড়িয়ে আসেন সেবাপ্রার্থীরা। গোমড়া মুখ নিয়ে অফিসের সামনে দাঁড়িয়ে ক্ষেদ ঝাড়ছিলেন উপজেলার সীমান্তবর্তী রঙ্গাছড়া পশ্চিম এলাকা থেকে আসা আক্তার আলী (৬৮) নামে এক ভুক্তভোগী। তিনি বলছিলেন, নিজের ৬০ শতাংশ জমির কর পরিশোধ করতে ইউনিয়ন ভূমি অফিসে মাসের পর মাস ঘুরতে হচ্ছে। ঘুষ না দেয়ায় কাজ হচ্ছে না। ওই ভুক্তভোগীর কথায় ‘ঠিক ঠিক’ বলে আওয়াজ তুলে সায় দিচ্ছিলেন নামজারি ও খাজনা দিতে আসা অন্যান্য সেবা প্রত্যাশীরাও। নামজারি ও খাজনার নামে এখানে অবাধে চলে ঘুষ-বাণিজ্যের রমরমা অবস্থার চিত্র তুলে ধরতে তারাও হয়ে উঠেন সরব। 

রঙ্গাছড়া বাসিন্দা আক্তার আলী বলেন, আমি কিছু দিন আগে আমার পৈতৃক ৬০ শতাংশ জমির কর পরিশোধ করতে ভূমি অফিসে যাই, আমার কাছে ৭৪ হাজার টাকা কর দাবি করেন, মনে দুঃখ নিয়ে ফিরে আসি। পরদিন আবারো আমার জমির আংশিক খাজনা দিতে গেলে তিনি খাজনা নিতে অপারগতা প্রকাশ করেন। এবং খাজনা বাবদ আগের দিনের ৭৪ হাজার টাকার পরিবর্তে ১ লাখ টাকা দাবি করেন। তখন আমি তাকে এর কারণ জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, আইনে খাজনা বাবদ ১ লাখ টাকা আসে। 
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা( তহসিলদার) রঞ্জন কুমার দাস থেকে শুরু করে  অফিসের পিয়ন, ঘুষ-দুর্নীতির ‘রসের হাঁড়িতে’ মজে অনিয়মকে রূপ দিয়েছেন নিয়মে! আর এতে করে প্রতিনিয়ত হয়রানির ও প্রতারণার শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। 

স্থানীয় সূত্র জানায়, ১ নং শ্রীপুর উত্তর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের তহসিলদার রঞ্জন কুমার দাস টাকা ছাড়া কোনো কাজই করেন না। নামজারি (নাম খারিজ), ডিসিআর, দাখিলার ও খাজনার জন্য তাকে আলাদা আলাদা টাকা দিতে হয়। কখনো টাকা দিলেও জুটে না নামজারি। 

খাজনার দাখিলার জন্য (ভূমি উন্নয়ন করের রসিদ) সরকার নির্ধারিত ফি’র চেয়েও অতিরিক্ত টাকা আদায় করলেও আবার রশিদ দেয়া হয় সরকারি হিসাবেই। এসবের মাধ্যমে প্রতি মাসে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা রঞ্জন কুমার দাস, দৌরাত্ম বেড়েছে দালাল সিন্ডিকেটেরও। 

সোমবার (১৪ সেপ্টেম্বর) সরেজমিনে গেলে ঘুষ-দুর্নীতির খণ্ড খণ্ড নমুনা চোখে পড়ে। জমির খাজনা নিচ্ছেন ১৬ হাজার রশিদ দিচ্ছেন ২ হাজার টাকার। প্রায় ৫০ টিরও বেশি রশিদে গড়মিল। এভাবে দুর্নীতি করে প্রায় লাখ টাকা হাতিয়ে নিলেন একদিনে। প্রতিদিনেই দুর্নীতি করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে ইউনিয়ন ভূমি কর্মকর্তা ( তহসিলদার ) রঞ্জন কুমার দাস।
পরোক্ষভাবে জানা যায়, স্থানীয় কয়েকজন কথিত সাংবাদিক নামধারী ব্যক্তিকে মাসোহারা চাঁদা দিয়ে ইউনিয়ন ভূমি অফিসকে দুর্নীতির সর্গ রাজ্য হিসেবে পরিনত করেছেন ওই ভূমি কর্মকর্তা।  

মরন্ডা মৌজার ৫৪ নম্বর খতিয়ানের ০.৩০ একর জমি খাজনা পরিশোধ করতে আব্দুল মন্নাফ প্রায় এক মাস আগে এ ভূমি অফিসে যান। ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা রঞ্জন কুমাদ দাস ১০ হাজার টাকা দাবি করায় রাগে-ক্ষোভে গত এক মাস অফিসের চৌহদ্দীতেও ভিড়েননি তিনি। 

অন্য উপায় না পেয়ে ৫ হাজার টাকা পকেটে নিয়ে আবারও আসলেন ইউনিয়ন ভূমি অফিসে। পরিচয় গোপন করে কয়েকজন সংবাদকর্মীও ছিলেন উনার সাথে। পূর্বের মতো আবার ভূমি কর্মকর্তা ১০ হাজার টাকা দাবী করলেন, অবশেষে ৫ হাজার টাকা খাজনা নিতে রাজি হলেন ওই ভুমি কর্মকর্তা। পরে ৫ হাজার টাকা নিয়ে রশিদ দেয়া হয় ১০১০ টাকার।

আরেক ভুক্তভোগী- কেরামত আলী, ব্রাহ্মনগাঁও মৌজার ৩৪০ নং খতিয়ানের ০.২২৫০ একর জমির কর (খাজনা) পরিশোধ করতে তহসিলদারকে ২ হাজার টাকা দেন, রশিদে দেয়া হয় মাত্র ৭৪৬ টাকার।  

ঘুষ দাবির অভিন্ন চিত্র তুলে ধরেন চিকার কান্দি মৌজার জমির মালিক নবী হোসেন । তিনি বলেন, ‘আমার ০.২৪ একর জমির খাজনা পরিশোধ করতে বেশকিছু দিন ধইরা তহসিলদারকে কইতাছি। তিনি ৮ হাজার টাকা চাইছেন। আমার পরিচিত একজন'রে দিয়া সুপারিশ কইরা ৫ হাজার টাকায় রাজি করছি। পুরো টাকা দিলেও রশিদে লিখছে মাত্র ৬শত ১০ টাকা টাকা।  
রঙ্গাছড়া পশ্চিম মৌজায় ফজলুর রহমানের নিজ বাড়ীর ০.৫ একর জমির খাজনা বাবদ ১৩৭৯ বাংলা সন হতে ১৪২৭ বাংলা সন পর্যন্ত ৪৮ বছরের খাজনা পরিশোধ করতে দেয়া ১২ হাজার টাকা। উনাকেও মাত্র ২হাজার ৮শত টাকার রশিদ দেয়া হয়। 
ভুক্তভোগীরা আরো অভিযোগ করেন, রঞ্জন কুমার দাসের ঘুষ বাণিজ্য’ অনিযম’ দুর্নীতি ও নিজের নিয়োজিত দালাল-কর্মচারী সিন্ডিকেটের উৎপাতে সাধারণ মানুষ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন। গোটা ভূমি অফিস হয়ে উঠেছে অনিয়ম-দুর্নীতির আখড়া। এক্ষেত্রে ভয়ভীতিরও বালাই নেই। 


এ প্রতিবেদকের নিকট ভিডিও ফুটেজসহ সম্পূর্ণ প্রমাণাদি সংরক্ষিত আছে।

শেয়ার করুনঃ
আপনার মতামত লিখুন: